|হাসান মেহেদী|
প্রশাসনিক কাঠামোয় বিকেন্দ্রীকরণের মূল লক্ষ্য হলো—রাষ্ট্রের সেবা প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ফটিকছড়ির উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি ‘উপজেলা বিভাজন’-এর প্রেক্ষিতে গত ১ জুলাই নিকার সভায় ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা গঠনের প্রাথমিক অনুমোদন এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন জানাই, কারণ এটি প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ মানুষের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে।
কিন্তু আনন্দের এই মুহূর্তটি কিছুটা হলেও ম্লান হয়েছে উপজেলা সদর দপ্তর নির্ধারণের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে। সম্প্রতি প্রকাশিত গেজেটে ভূজপুর পশ্চিম মৌজাকে সদর দপ্তর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ভৌগোলিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক ভারসাম্যের বিচারে চরম অসামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভোগান্তি কমানো। অথচ ভূজপুর থেকে উত্তরের শেষ প্রান্তের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। পাহাড় ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্তঘেঁষা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, চা-শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য এই দূরত্ব অতিক্রম করে উপজেলা সদরে আসা কার্যত দুঃসাধ্য। এমন একটি প্রশাসনিক বিন্যাস গড়ে তোলা কি জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে না?
দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন ভৌগোলিক কেন্দ্রিকতা। দাঁতমারা ও নারায়ণহাটের মধ্যবর্তী কোনো উপযুক্ত স্থানে সদর দপ্তর স্থাপন করলে তা সবদিক থেকে ভারসাম্যপূর্ণ হবে।
আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন দর্শন সবসময়ই জনবান্ধব। সেই অঙ্গীকারের আলোকে আমাদের কিছু যৌক্তিক দাবি ও সুপারিশ যথাযথ কর্তৃপক্ষের সদয় বিবেচনার জন্য পেশ করছি:
প্রথমত, ভৌগোলিক অবস্থান ও বৃহত্তর জনস্বার্থ বিবেচনায় প্রস্তাবিত উপজেলার সদর দপ্তর অবশ্যই দাঁতমারা ও নারায়ণহাটের মধ্যবর্তী কোনো উপযুক্ত স্থানে স্থাপন করতে হবে। এটিই হবে উত্তরের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই সমাধান।
দ্বিতীয়ত, এলাকার বিশাল আয়তন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দাঁতমারা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রকে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ থানায় উন্নীত করা একান্ত প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেন নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত না হয়ে প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে ইউনিয়নভিত্তিক গণশুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমরা সরকারের দায়িত্বশীল মহলের প্রতি বিনীত আহ্বান জানাই—প্রকাশিত গেজেটটি পুনর্বিবেচনা করা হোক। ফটিকছড়ি উত্তরের বাসিন্দাদের প্রাণের দাবিকে সম্মান জানিয়ে এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করুন, যা প্রকৃত অর্থেই গণমানুষের উপকারে আসবে। আমরা আশা করি, উন্নয়ন ও সেবার মূলমন্ত্রকে ধারণ করে বর্তমান সরকার উত্তরের মানুষের এই যৌক্তিক দাবির প্রতি সদয় হবেন এবং দীর্ঘস্থায়ী জনদুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
লেখক : কলেজ শিক্ষক ও মুক্ত সাংবাদিক
যুগ্ম আহবায়ক, উত্তর ফটিকছড়ি নাগরিক ফোরাম